ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদীর ওপর দিন-দুপুরে যে সশস্ত্র হামলা হয়েছে, তা নিয়ে গোটা দেশজুড়ে চলছে তোলপাড়। গত শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর ২০২৫) বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় তাঁকে গুলি করে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায়। এই ঘটনার পরই রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা ও প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নগুলোর তীর ঘুরছে প্রশাসনের দিকেই।
হামলাকারী কি ধরাছোঁয়ার বাইরে? - অভিযোগের আঙুল কেন সরকারের দিকে?
হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনা ঘটিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও যেভাবে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, তাতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে – হামলাকারীরা কি বিশেষ কোনো মহলের ছত্রছায়ায় আছে? যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (পুলিশ ও র্যাব) ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে এবং হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে জোর তল্লাশি চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে। ইতিমধ্যে র্যাব-২ হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিক আব্দুল হান্নানকে আটক করেছে বলেও জানা যায়।
কিন্তু এরপরেও একটি মহলের তীব্র অভিযোগ, এই হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করছে, এবং প্রশাসন এক্ষেত্রে ধীরগতিতে চলছে। বিএনপি ও জামায়াতসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে সরাসরি এই হামলার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিশেষ করে, নাটোর জেলা বিএনপি এক সমাবেশে এই ঘটনার সঙ্গে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ জড়িত বলে মন্তব্য করে এবং এক নেতার দাবি, হামলাকারী ছিল আদাবর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি।
এই অভিযোগের ফলে জনগণের একাংশের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে যে, সরকার ও প্রশাসন যেনো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, এবং হামলাকারীদের পালাতে বা রক্ষা করতে সাহায্য করছে।
আতঙ্কের মুখে গণতন্ত্র ও নির্বাচন - কী বলছেন বিশ্লেষকরা?
ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনাটি ঘটেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর ওপর দিনের আলোয় এমন সশস্ত্র হামলা সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মনে করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠন।
অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীরাও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, হাদির ওপর এই হামলা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকেই স্পষ্ট করে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে এমন প্রবণতা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে এবং এর ফলে গৃহযুদ্ধের মতো ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তারেক রহমানসহ অন্যান্য বিরোধী দলের নেতারা এই হামলাকে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ওসমান হাদীর বর্তমান অবস্থা: মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা
গুরুতর আহত অবস্থায় শরিফ ওসমান হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা চিকিৎসাধীন থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। তিনি এখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। তাঁর সুস্থতার জন্য দেশজুড়ে চলছে প্রার্থনা।
হামলার পেছনে যেই-ই থাকুক না কেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে দেশে অবৈধ অস্ত্র ও পেশাদার সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বেড়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে। জনগণের চাওয়া, অবিলম্বে প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক এবং এর মাধ্যমে সরকারের কথিত 'নিরাপত্তার জাল' নিয়ে ওঠা সব প্রশ্ন দূর করা হোক।

0 coment rios:
আপনার মতামত দিন